1. admin@shadhin-desh.com : admin :
মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১০:২৯ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
শেরপুরে হেলমেট না থাকলে মিলবেনা তেল কার্যক্রমের উদ্বোধন নরসিংদীর মনোহরদীতে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী হলেন যাঁরা মাদারিপুরে পল্লী বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিলে বিপাকে গ্রাহক ফ্রান্স প্রবাসী সালাউদ্দিন প্রাণে মারার হুমকি ও মানহানির কারণে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদানে “সচেতনতামূলক” সভা অনুষ্ঠিত নওগাঁয় লিগ্যাল এইডের গণশুনানী অনুষ্ঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভা ও মাসিক অপরাধ সভা অনুষ্ঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ক্লিনিক মালিক সমিতির কমিটি গঠন শিবগঞ্জ সীমান্তে পিস্তল-গুলিসহ যুবক আটক রাঙামাটিতে অস্ত্রসহ ৫ চাঁদা কালেক্টর আটক

পিসোদের জাস্টিসের কবলে

  • আপডেট সময় : শুক্রবার, ১১ মার্চ, ২০২২
  • ১২৯ বার পঠিত

মঈদুল ইসলাম
ন্যায়বিচারী ছিলেন না পিসো। আদতে বিচারক-বিচারপতিই ছিলেন না। ছিলেন সেনাপতি, হয়েছিলেন প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের এক প্রশাসক। ইতিহাসে বদমেজাজি এই গ্ন্যায়াস ক্যালপার্নিয়াস পিসো ৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কনসাল হিসেবে পরিচিত। এককালে তো বিচার-আচারের কাজও শাসক-প্রশাসকদেরই হাতে ছিল পুরোপুরি। ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক বিচারের কাজ বিচারকদের ঘাড়ে চাপালেও জট পাকানোর গোড়াটা আর খসানোর শেষ মাথাটা বরাবরই তাদের হাতে। শাসন-প্রশাসনের কাজেও তো ন্যায়াচার করার আছে। ন্যায়সংগত হুকুম জারিতে ন্যায়-অন্যায়ের বাছ-বিচার করার থাকে যুক্তি দিয়ে। বাছ-বিচারের বোধ হারিয়ে হেকমতি ফলিয়ে নিষ্ঠুর অন্যায় সাধন শেষে উল্টো যখন সেটাকেই ন্যায় সাধন বলে উদ্ভট যুক্তি হাজির করা হয়, তখনই পিসোর কথা এসে পড়ে। এ-কাজের আদি গুরু নাকি তিনিই। তেমনটাই জানা যায় সেনেকার ‘ডায়ালগ’ থেকে। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের সিনেটর সেনেকা (৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-৬৫ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন জেনোর অনুসারী নিরাসক্তবাদী দার্শনিক, নাট্যকার ও স্যাটায়ারিস্ট।

পিসোর বাহিনীর এক সৈনিক আরেক সৈনিক গেইয়াসের সঙ্গে রসদের খোঁজে বেরিয়ে ফিরে আসে একাই। তার সঙ্গে গেইয়াস ফিরে না আসার সদুত্তরও দিতে পারে না সে। আর কি প্রমাণ লাগে! গেইয়াসকে এই সৈনিকই খুন করে ফেলেছে বলে পিসো তক্ষুনি সাব্যস্ত করে তার শিরেদের হুকুম দেন সেন্টুরিয়ানকে (জল্লাদ)। সেন্টুরিয়ান যেই না কোপ তুলেছে অমনিই সশরীরে এসে খাড়া গেইয়াস নিজে। খাঁড়া ফেলে দুজনকে নিয়ে সেন্টুরিয়ান মহানন্দে ছুটে যায় পিসোর কাছে, গেইয়াস খুন হয়নি দেখাতে। পিসো দেখেই ‘ফিয়্যাট জাস্টিসিয়্যা রুয়্যাট সিলাম’ (‘স্বর্গ/আকাশ ভেঙে পড়লেও ন্যায়বিচার নিষ্পন্ন হতেই হবে) বলে তিনজনেরই শিরেদের হুকুম দেন সঙ্গে সঙ্গে। উদ্ভট তার যুক্তি! সৈনিকটির মৃত্যুদন্ড দেওয়াই আছে, দন্ড কার্যকর না করায় আদেশ লঙ্ঘনের অপরাধী সেন্টুরিয়ান, আর গেইয়াস তো ওই দুজনের মৃত্যুদন্ডের মূর্তিমান কারণ! সেনেকা বলছেন, ‘যেখানে একটাও অপরাধ ঘটেনি সেখানে এমন উদ্ভট যুক্তিতে তিন তিনটা অপরাধ খুঁজে পাওয়া সম্ভব কেবল ক্রোধে বিবেকহারা হলেই।’ বিনা দোষে দোষ ধরে নির্দোষের দন্ড দানকান্ডকে, ক্ষমতার যত সব বিবেকহীন প্রয়োগকে ‘পিসোর জাস্টিস’ বলে। পিসো গেছে মরে আত্মহত্যা করে, বিচারে দন্ড পাওয়ার ভয়ে। সাগরেদ হয়ে জন্মায় নতুন নতুন পিসো। তাদের জাস্টিসে উৎপাদিত হয় নিষ্ঠুর অবিচার। কোপে পড়া বেশির ভাগ কপাল চাপড়ে মরে নিজ ঘরে, কেউ-বা আদালতের ঘরে কপাল ঠুকতে আসে (ঘাম নিঃসরণ আর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ বৃদ্ধি টের পায় পরে)।

বলা নেই কওয়া নেই, চাকরি নেই হঠাৎ হুকুমে পিসোদের জাস্টিসে উৎপাদিত এমন অনেক অবিচারের দেখা পেয়েছি জজিয়তিকালে। প্রথম কর্মস্থলেই পাই বিনা দোষে চাকরি হারা কপালপোড়া ব্যাংক কর্মচারীদের। ১৯৮১ সালে ব্যাংক কর্মচারী ইউনিয়নের ডাকে ধর্মঘট হয় দেশ জুড়ে (ব্যাংক তখনো আসেনি বেসরকারিতে)। ইউনিয়ন নেতা দু-চারজন পড়লেও নির্বিচারে ছাঁটাই হয় নিরীহ বেচারারা। কপাল ঠুকতে তারা কেউ কেউ আসে কুড়িগ্রামের মুন্সেফিতে। ১৯৮২ সালে আদালত উপজেলায় গেলে জেলা থেকে অন্যান্য মামলার সঙ্গে সেগুলোও যায় উপজেলা আদালতে। তারই অবশেষ দু-চারটি বিচারাধীন পাই চিলমারীতে ১৯৮৯-তে গিয়ে। এরপর কালে কালে পেয়েছি বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক, এক মুন্সেফ, আরও কত বেচারা। আমার রায় পাওয়া সবার চাকরি ফিরে পাওয়ার খবর আর পাইনি। তবে, জ্ঞান বাবু আর মুন্সেফি ফিরে পাননি পিসোদের হেকমতির চোটে। হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ পার হওয়ার অনেক আগেই তার অবসরের বয়স পার। বকেয়া বেতন, অবসর সুবিধা পেতে পেতে ডাক আসে পরপারের। বিচারফল লাভের আশায় থেকে থেকে তার স্বর্গলাভের পরিণতি বলেছি ‘বিচারফলের জ্ঞানকান্ড’-তে।

১৯৯৪-এর সেপ্টেম্বরে নড়াইলে গিয়ে পেলাম এক আবদারি মামলা। সরকারের আবদার একখ- জমির অর্ধেকটা ‘অর্পিত সম্পত্তি’ বলে ডিক্রি দিতে হবে। ‘অর্পিত সম্পত্তি’ (ভেস্টেড প্রোপার্টি) হলো সরকারে অর্পিত ‘এনিমি প্রোপার্টি’ (শত্রু সম্পত্তি)। ‘এনিমি প্রোপার্টি’ আবার কী? এই তো কাম সেরেছে! এও পিসোদের জাস্টিসে উৎপাদিত মহা-ভজকট, রেশ কাটেনি এখনো। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ লেগেছিল ১৯৬৫ সালে। ৬ সেপ্টেম্বর জরুরি অবস্থার সঙ্গে জারি হয় ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স’। ওই জমির মালিক কি তবে ভারতের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করেছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে? না ভাই, শুনুন মন দিয়ে! সেই অর্ডিন্যান্সের অধীনে হয় ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস’। তাতেই হলো, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ব্যক্তি ও রাষ্ট্র (২ বিধি) এবং শত্রুরাষ্ট্রে থাকা সাধারণ লোকও ‘এনিমি’ (১৬৯ বিধি)। এসব ‘এনিমি’র যেসব প্রোপার্টি আছে পাকিস্তানে সেসবই এনিমি প্রোপার্টি।

খাঁটি ভারতীয়রা কি পাকিস্তানে সম্পত্তি করে রেখেছে! শুরু হলো পিসোদের হেকমতি। এসএ (স্টেট অ্যাকুইজিশন) খতিয়ান ধরে খোঁজা ধরে সম্পত্তি ফেলে জান নিয়ে কারা পাকিস্তান থেকে ভেগে আশ্রয় নিয়েছে শত্রুরাষ্ট্র ভারতে। হিন্দুই তো যাবে হিন্দুস্তানে! সরল অঙ্ক! যে হিন্দু নেই পাকিস্তানে সে হিন্দুই আছে হিন্দুস্তানে! হিন্দুস্তানের কোনখানে তার খবরের দরকার নেই! তালিকা হলো, ছাপা হলো এনিমি প্রোপার্টির সেন্সাস লিস্ট। যারা ভেগেছে তাদেরটা তো হলোই, না ভেগে যারা ভুগেছে তাদেরও অনেকের সম্পত্তি উঠল লিস্টে। ভারতে থাকা মুসলমানের সম্পত্তি এনিমি প্রোপার্টি করতে স্পষ্ট বারণ ছিল ১৯৬৮-এর ২৬ জুনের আদেশে। তাই, ভারত থেকে আসা মুসলমানের সম্পত্তি উঠল লিস্টে। যুদ্ধের আগে যারা ভারত থেকে এসে হিন্দুর সম্পত্তি নিয়েছিল বিনিময় করে তাদের-গুলোও এনিমি প্রোপার্টি তালিকাভুক্ত হলো।

১৯৬৬-এর ১০ জানুয়ারি হিন্দুস্তান-পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলো উজবেকিস্তানে (রাজধানী তাসখন্দে)। থেমে গেল যুদ্ধ। থেকে গেল যুদ্ধাবস্থা আর জরুরি অবস্থা। সেটাও উঠে গেল ১৯৬৯-এর ১৬ ফেব্রুয়ারিতে। মারা গেল ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স’ আর তার রুলস। ১৯৭১-এ পাকিস্তানই অক্কা পেল বাংলাদেশে। যুদ্ধে গেল বীর বাঙালি, আশ্রয় নিল আবার সেই ভারতে। স্বাধীন হলো বাংলাদেশ। শত্রু সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তিই রয়ে গেল। আইন করে করে জিইয়ে রাখা চলে শত্রু সম্পত্তি। তালিকা করা কি থামে! ১৯৬৯-এর ১৬ ফেব্রুয়ারিতে যে-অধ্যাদেশে শত্রু সম্পত্তি প্রথম জিইয়ে রাখা হয় সেই অধ্যাদেশ বাতিল হলো ১৯৭৪-এর ২৩ মার্চ এক অধ্যাদেশে। সেদিনই আরেক অধ্যাদেশে শত্রু সম্পত্তিকে করা হয় অর্পিত সম্পত্তি।

তালিকায় ফেঁসে যাওয়া লোকরা কপাল ঠুকতে ভিড় করে আদালতে। আগে থেকেই ঠাসা ছিল শত্রু সম্পত্তির মামলাতে। নতুন করে লেগে গেল অর্পিত সম্পত্তির মামলা। তালিকা থেকে অবমুক্তি, নিষেধাজ্ঞা চায়। হাতে গোনা দু-চারটি মামলায় ছাড়া ছাপানো সেন্সাস লিস্ট হাজির করতে দেখিনি সরকার পক্ষকে। হাতে লেখার কার্বন কপি সব। কার্বন কপির তালিকা দিয়ে অর্পিত সম্পত্তির ছাপ মারা সরকার পক্ষ আদালতের ডিক্রি চায় অর্পিত সম্পত্তি বানাতে! আরজি লিখেছে, জমিটার সিএস (ক্যাডস্ট্রাল সার্ভে) খতিয়ানের হিন্দু মালিকের ছিল দুই ছেলে। এসএ খতিয়ানে ভুলভাবে রেকর্ড হয়েছে শুধু এক ছেলের নামে। আরেক ছেলে নির্ভুলভাবে ভেগে গেছে ওই শত্রুরাষ্ট্র ভারতে। তাই অর্ধেকটা অর্পিত সম্পত্তি পিসোদের যুক্তিতে! ভুল এসএ খতিয়ানটা বানিয়েছে কে? সরকারে। সেন্সাস লিস্ট, তালিকা? সেও সরকারে। এসএ খতিয়ানের সেই ছেলের থেকেই বছর বছর সরকার খাজনা যে নিচ্ছে পুরো জমির? চিত্রা নদীর পাড়ের জমিটা তো ডিসির বাংলোর পাশঘেঁষে! একাই ভোগ করা সেই ছেলে তো নড়াইল কোর্টেই ওকালতি করে চলেছে। এতকাল ধরে সরকারের এত সব হয়ে চলেছে ভুলে ভুলে! এবারের মামলাটা কি ঠিক আছে? কার্বন কপির তালিকা ছেড়ে আদালতের ডিক্রি ধরার কায়দাটা তো বেশ! বেকায়দায় ফেলার এ-মামলায় জিতবে কী করে? ডিসমিস হলো মামলা। হিসাব কষে কয়েক লাখ টাকা খরচার আদেশ দিই বিবাদীর পক্ষে। যেসব পিসোর হেকমতিতে মামলাটা হয়েছে তাদের থেকে সে-টাকাটা আদায় করে নিতে বলি সরকারকে।

আরেক জেলায় দেখি খাস খতিয়ানে জমিটার রেকর্ড ভুল বলে সরকারের বিরুদ্ধে দোরফাসূত্রে স্বত্বের ডিক্রি পেয়েও মুশকিল আশান হচ্ছে না মক্কেলের। নামজারি জমা খারিজ হচ্ছে না ভূমি অফিসে। আপিলও করে না, ডিক্রিও মানে না পিসোরা। গোঁ ধরে বসে আছে। কয়েক বছর ভূমি অফিস-ডিসি অফিস করে করে হয়রান বেচারা নামজারি জমা খারিজ পেতে সরকারের বিরুদ্ধে ম্যান্ডেটরি ইনজাংশন চায় আমার আদালতে। সরকার পক্ষ এলো, ডিক্রি হলো আবার দোতরফাসূত্রে। গোঁ ছোটে না কিছুতে। ডিক্রিদার বেচারা শেষে এসি (ল্যান্ড) থেকে ডিসি পর্যন্ত কর্তাদের সিভিল জেল ও বেতন ক্রোক চেয়ে ডিক্রি জারি মামলা করে। শোকজ নোটিস গেল, সরকারি উকিল (জিপি) এলো টাইম পিটিশন হাতে। নামজারি জমা খারিজও করে না, আপিলও করে না ম্যান্ডেটরির বিরুদ্ধে। শুধুই টাইম চায় জারিতে। দিতে দিতে শেষে শেষ হলো টাইম দেওয়া। জেলের বদলে তাদের এক শ টাকা বাদে বাকি অর্ধেক বেতন ক্রোক করি, টাকাগুলো বেতন-বিল থেকে কেটে আদালতে পাঠাতে বলি এজি অফিসকে। আপিল না করে নিজেদের বেতন-বিল করা পুরোটাই বন্ধ করে। দেরিতে বুদ্ধি পেয়ে কয়েক মাস পরে যায় হাইকোর্টে, জারি মামলাটা অন্য জেলায় বদলির ছুতাতে (যদিও আমি বদলি হয়ে চলে গেছি আগে)। ক্রোকের আদেশটা বদলির মামলায় হাইকোর্টে স্থগিত করিয়ে পুরো বেতন তোলা ধরে। পিসোদের জাস্টিসে উৎপাদিত হয় অবিচার। চাপ পড়ে আদালতে। সুবিচার কতটার হবে কোনকালে! বিচারের ফলও ফলে না পিসোদের হেকমতির চোটে। ন্যায়বিচার নাজেহাল পিসোদের জাস্টিসের কবলে।

লেখক- অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

moyeedislam@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর

ফেসবুকে আমরা

© All rights reserved © 2022 © Shadhin Desh
Theme Customized By Theme Park BD
error: Content is protected !!